বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জেলা হলো সুনামগঞ্জ। বিস্তীর্ণ হাওর, পাহাড়ঘেরা সীমান্ত, বর্ষায় জলমগ্ন গ্রাম আর শুষ্ক মৌসুমে সোনালি ফসল—সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ প্রকৃতি ও মানুষের এক অসাধারণ সহাবস্থানের নাম। এই জেলা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনাময় অর্থনীতির জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত।
সুনামগঞ্জ জেলার ভৌগোলিক অবস্থান
সুনামগঞ্জ জেলা সিলেট বিভাগের অন্তর্গত।
-
উত্তরে: ভারতের মেঘালয় রাজ্য।
-
দক্ষিণে: কিশোরগঞ্জ জেলা।
-
পূর্বে: সিলেট জেলা।
-
পশ্চিমে: নেত্রকোণা জেলা।
এই জেলার একটি বড় অংশ হাওর অঞ্চল হওয়ায় প্রতি বছর বর্ষাকালে এখানে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
সুনামগঞ্জ জেলার ইতিহাস
সুনামগঞ্জের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। একসময় এটি সিলেট জেলার অংশ ছিল। ১৯৮৪ সালে সুনামগঞ্জ পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই অঞ্চলে সুফি-সাধক ও ইসলামি চিন্তাবিদদের আগমন ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। শাহ আরেফিন, হযরত শাহ জালালের অনুসারীদের প্রভাব এখানকার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে আজও বিদ্যমান।
নামকরণের ইতিহাস
জনশ্রুতি অনুযায়ী, ‘সুনামগঞ্জ’ নামটি এসেছে “সুনাম উদ্দিন” নামক এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম থেকে। আবার কেউ কেউ বলেন, ভালো খ্যাতি বা “সুনাম”-এর জন্যই এ অঞ্চলের নাম সুনামগঞ্জ।
সুনামগঞ্জের উপজেলাসমূহ
সুনামগঞ্জ জেলায় মোট ১২টি উপজেলা রয়েছে—
১. সুনামগঞ্জ সদর
জেলার প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল ও বড় বাজার এখানে অবস্থিত।
২. ছাতক
শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানে সিমেন্ট কারখানা ও গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর রয়েছে।
৩. তাহিরপুর
হাওর ও পর্যটনের জন্য বিখ্যাত উপজেলা। টাঙ্গুয়ার হাওর ও যাদুকাটা নদী এখানে অবস্থিত।
৪. ধর্মপাশা
হাওরবেষ্টিত কৃষিপ্রধান এলাকা। ধান ও মাছ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৫. দিরাই
শিক্ষা ও সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। এখানকার মানুষ সাহিত্য ও লোকসংগীতে আগ্রহী।
৬. জামালগঞ্জ
হাওর ও নদীকেন্দ্রিক উপজেলা। কৃষি ও মাছ চাষ এখানকার প্রধান জীবিকা।
৭. শাল্লা
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও হাওর অঞ্চল নিয়ে গঠিত। শান্ত পরিবেশ ও গ্রামীণ জীবনধারা এখানকার বৈশিষ্ট্য।
৮. জগন্নাথপুর
প্রবাসী অধ্যুষিত উপজেলা। প্রবাসী আয়ের কারণে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ।
৯. দোয়ারাবাজার
ভারত সীমান্তসংলগ্ন এলাকা। বাণিজ্য ও কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
১০. বিশ্বম্ভরপুর
হাওর ও নদীবেষ্টিত উপজেলা। মাছ ধরা ও কৃষি এখানকার প্রধান পেশা।
১১. দক্ষিণ সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জ শহরের নিকটবর্তী উপজেলা। কৃষি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম এখানে গড়ে উঠেছে।
১২. মধ্যনগর
নতুন গঠিত উপজেলা। হাওরনির্ভর কৃষি ও মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ।
হাওর ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
সুনামগঞ্জ মানেই হাওর। দেশের সবচেয়ে বড় হাওরগুলোর অনেকগুলোই এখানে অবস্থিত—
-
টাঙ্গুয়ার হাওর (রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃত)।
-
হাইল হাওর।
-
শনির হাওর।
বর্ষাকালে নৌকাভ্রমণ, নীল আকাশের প্রতিফলন, জলজ পাখির কলকাকলি—সব মিলিয়ে হাওর হয়ে ওঠে পর্যটকদের স্বর্গ।
পর্যটন আকর্ষণ
সুনামগঞ্জে ঘুরে দেখার মতো অসংখ্য স্থান রয়েছে—
-
টাঙ্গুয়ার হাওর: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি।
-
বারিক্কা টিলা: পাহাড় ও নদীর মিলনস্থল।
-
লাউয়ের গড়: ঐতিহাসিক নিদর্শন।
-
শিমুল বাগান: বসন্তকালে লাল শিমুলে ভরে ওঠা প্রাকৃতিক উদ্যান।
-
যাদুকাটা নদী: স্বচ্ছ জল আর পাথরের সৌন্দর্য।
অর্থনীতি ও জীবিকা
সুনামগঞ্জ জেলার অর্থনীতি প্রধানত কৃষিনির্ভর।
-
ধান চাষ এখানকার প্রধান ফসল।
-
মাছ ধরা ও মাছ চাষ গুরুত্বপূর্ণ জীবিকা।
-
পাথর ও বালু উত্তোলন বহু মানুষের আয়ের উৎস।
-
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সও অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে।
সংস্কৃতি ও জীবনধারা
সুনামগঞ্জের মানুষ সহজ-সরল ও অতিথিপরায়ণ। এখানকার লোকসংগীত, বাউল গান, ভাটিয়ালি গান বিশেষভাবে জনপ্রিয়। নদী ও হাওরকেন্দ্রিক জীবনধারা এখানকার সংস্কৃতিকে করেছে স্বতন্ত্র।
শিক্ষা ও যোগাযোগ
সুনামগঞ্জে বেশ কয়েকটি কলেজ, মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সড়ক ও নৌপথ—দুটো মাধ্যমেই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বর্ষাকালে নৌপথই হয়ে ওঠে প্রধান ভরসা।
পরিশেষ
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, হাওরের জীবন, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও শান্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ একটি অনন্য জেলা। যারা প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করতে চান, তাদের জন্য সুনামগঞ্জ নিঃসন্দেহে এক আদর্শ গন্তব্য।

