বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলায় আছে এক অপূর্ব অথচ তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত দ্বীপ—শাহাপুরীর দ্বীপ। নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে গড়ে ওঠা এই দ্বীপ প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য এক অনন্য গন্তব্য। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, শান্ত ও নিসর্গঘেরা পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে চাইলে শাহাপুরীর দ্বীপ হতে পারে আদর্শ স্থান।
শাহাপুরীর দ্বীপের অবস্থান ও পরিচিতি
শাহাপুরীর দ্বীপ কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। এটি নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ, যার এক পাশে মিয়ানমার সীমান্ত এবং অন্য পাশে বঙ্গোপসাগর। ভৌগোলিক দিক থেকে এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী অঞ্চল।
লোককথা অনুযায়ী, আরাকান রাজ্যের এক রাজা শাহাপুরীর নামানুসারেই এই দ্বীপের নামকরণ করা হয়েছে। যদিও ইতিহাসে এর লিখিত প্রমাণ খুব বেশি নেই, তবে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে এই কাহিনি আজও প্রচলিত।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ
শাহাপুরীর দ্বীপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এখানে নদী ও সাগরের মিলন একসঙ্গে দেখা যায়, যা বাংলাদেশের খুব কম জায়গায় সম্ভব। দ্বীপজুড়ে রয়েছে কেওড়া, গেওয়া ও ম্যানগ্রোভ জাতীয় গাছপালা। এসব গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি দ্বীপকে করেছে আরও সবুজ ও শীতল।
ভোরবেলা কিংবা বিকেলের দিকে এখানে অসংখ্য পরিযায়ী ও স্থানীয় পাখির আনাগোনা দেখা যায়। পাখির ডাক, নদীর ঢেউ আর সাগরের বাতাস মিলে এক ধরনের শান্ত আবহ তৈরি করে, যা মানসিক প্রশান্তির জন্য দারুণ উপকারী।
সূর্যাস্তের অনন্য দৃশ্য
শাহাপুরীর দ্বীপে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ। নাফ নদীর উপর দিয়ে সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যেতে থাকে, আর আকাশ রাঙা, কমলা ও সোনালি রঙে ভরে ওঠে। অনেক ভ্রমণকারী শুধুমাত্র এই সূর্যাস্ত দেখার জন্যই এখানে আসেন। ফটোগ্রাফারদের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান।
ইতিহাস ও গুরুত্ব
শাহাপুরীর দ্বীপ শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, কৌশলগত গুরুত্বের কারণেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী একটি এলাকা হওয়ায় এখানে কোস্ট গার্ড ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নজরদারি রয়েছে। অতীতে নাফ নদীপথে বাণিজ্য ও যোগাযোগে এই এলাকার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে যাবেন শাহাপুরীর দ্বীপ
শাহাপুরীর দ্বীপে যাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ।
ঢাকা থেকে:
ঢাকা থেকে বাসে করে কক্সবাজার যেতে হবে (প্রায় ১০–১২ ঘণ্টা)। কক্সবাজার থেকে টেকনাফের উদ্দেশ্যে বাস বা মাইক্রোবাস পাওয়া যায়।
টেকনাফ থেকে:
টেকনাফ পৌঁছে জেটিঘাট থেকে নৌকা বা ট্রলারে করে শাহাপুরীর দ্বীপে যাওয়া যায়। নৌকা ভ্রমণটাই অনেকের কাছে সবচেয়ে উপভোগ্য অংশ, কারণ এই পথে নাফ নদীর প্রাকৃতিক দৃশ্য দারুণ সুন্দর।
ভ্রমণের সেরা সময়
শাহাপুরীর দ্বীপ ভ্রমণের জন্য সেরা সময় হলো নভেম্বর থেকে মার্চ। এই সময় আবহাওয়া শীতল ও আরামদায়ক থাকে। বর্ষাকালে নদীর স্রোত বেশি থাকায় নৌযাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তাই এ সময় ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই ভালো।
কী দেখবেন ও কী করবেন
-
নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থল দেখা।
-
সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় উপভোগ।
-
ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফি।
-
নিরিবিলি পরিবেশে হাঁটাহাঁটি।
-
স্থানীয় জেলেদের জীবনযাপন দেখা।
খাবার ও থাকা ব্যবস্থা
শাহাপুরীর দ্বীপে বড় কোনো হোটেল বা রিসোর্ট নেই। সাধারণত পর্যটকরা টেকনাফে থেকে দিনের বেলা দ্বীপ ভ্রমণ করে ফিরে আসেন। টেকনাফে মাঝারি মানের হোটেল ও গেস্টহাউস পাওয়া যায়।
খাবারের ক্ষেত্রে টেকনাফে সামুদ্রিক মাছ, শুঁটকি ও স্থানীয় খাবার বেশ জনপ্রিয়। দ্বীপে গেলে নিজের সঙ্গে কিছু শুকনো খাবার ও পানি নিয়ে যাওয়া ভালো।
ভ্রমণ টিপস
-
পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন (সীমান্ত এলাকা হওয়ায় প্রয়োজন হতে পারে)।
-
নৌকা ভাড়া আগে ঠিক করে নিন।
-
পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন, ময়লা ফেলবেন না।
-
নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলুন।
কেন শাহাপুরীর দ্বীপে যাবেন
যদি আপনি ভিড়বিহীন, শান্ত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা একটি জায়গা খুঁজে থাকেন, তাহলে শাহাপুরীর দ্বীপ আপনার জন্য একেবারে উপযুক্ত। এটি একদিকে যেমন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপহার দেয়, অন্যদিকে মনকে দেয় গভীর প্রশান্তি।
পরিশেষ
শাহাপুরীর দ্বীপ বাংলাদেশের এমন একটি স্থান, যা এখনো পুরোপুরি পর্যটনের আলোয় আসেনি। তাই এখানকার প্রকৃতি এখনো অনেকটাই অক্ষত। সময় বের করে অন্তত একবার হলেও এই দ্বীপ ঘুরে দেখলে বাংলাদেশের প্রকৃত সৌন্দর্যের আরেকটি অনন্য রূপ আপনার চোখে ধরা দেবে।

