বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ জেলা হলো খাগড়াছড়ি। সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, ঝর্ণা, নদী আর বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে খাগড়াছড়ি প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য।
খাগড়াছড়ি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার একটি জেলা। এর আয়তন প্রায় ২,৭০০ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে রাঙামাটি, পূর্বে ভারতের মিজোরাম এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলা অবস্থিত।
খাগড়াছড়িকে অনেক সময় “পাহাড়ের রানী” বলেও ডাকা হয়।
খাগড়াছড়ির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
খাগড়াছড়ি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি হিসেবে পরিচিত ছিল। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রোসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে এখানে বসবাস করে আসছে এবং নিজেদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতি বজায় রেখেছে।
ব্রিটিশ শাসনামলে (১৮৬০ সাল নাগাদ) পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ শাসন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন খাগড়াছড়ি এলাকা প্রশাসনিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশ ছিল এবং সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে পরিচালিত হতো।
পাকিস্তান আমলে খাগড়াছড়ি পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর খাগড়াছড়ি স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ হিসেবে যুক্ত হয়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ১৯৮৩ সালে খাগড়াছড়িকে পৃথক জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বর্তমানে খাগড়াছড়ি পাহাড়ি সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের জন্য বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে পরিচিত।
খাগড়াছড়ির উপজেলাসমূহ
খাগড়াছড়ি জেলায় মোট ৯টি উপজেলা রয়েছে—
১. খাগড়াছড়ি সদর
জেলার প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। আলুটিলা গুহা, রিছাং ঝরনা ও টাউন ভিউ পয়েন্ট এখানে অবস্থিত।
২. দীঘিনালা
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর উপজেলা। দেবতার পুকুরের জন্য বিখ্যাত এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি।
৩. পানছড়ি
পাহাড়, ঝরনা ও বনাঞ্চলে ঘেরা এলাকা। মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস উল্লেখযোগ্য।
৪. মাটিরাঙ্গা
ভারত সীমান্তসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। সীমান্ত বাণিজ্য ও কৃষিকাজ এখানে প্রধান।
৫. রামগড়
ঐতিহাসিক ও সীমান্তবর্তী উপজেলা। ফেনী নদীর তীরে অবস্থিত এবং বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
৬. মহালছড়ি
ঘন পাহাড় ও বনাঞ্চলপূর্ণ এলাকা। পাহাড়ি সংস্কৃতি ও শান্ত পরিবেশের জন্য পরিচিত।
৭. মানিকছড়ি
চট্টগ্রামের সাথে সংযোগকারী উপজেলা। কৃষি ও ব্যবসা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৮. লক্ষ্মীছড়ি
দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা। চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ।
৯. গুইমারা
নবগঠিত উপজেলা। দ্রুত উন্নয়নশীল এলাকা এবং প্রশাসনিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতি
খাগড়াছড়ি জেলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মূল ভিত্তি হলো এখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এই অঞ্চলে বসবাস করে আসছে এবং তারা নিজেদের স্বতন্ত্র জীবনধারা, ভাষা ও সংস্কৃতি আজও অক্ষুণ্ন রেখেছে।
প্রধান পাহাড়ি জনগোষ্ঠী
খাগড়াছড়িতে বসবাসকারী উল্লেখযোগ্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলো হলো—
-
চাকমা।
-
মারমা।
-
ত্রিপুরা।
-
ম্রো।
-
খিয়াং।
প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, পোশাক, খাবার ও সামাজিক রীতি রয়েছে।
পোশাক ও জীবনধারা
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক সাধারণত হাতে বোনা কাপড় দিয়ে তৈরি।
-
নারীরা পিনন, খাদি ও থামি পরিধান করেন।
-
পুরুষরা সাধারণত লুঙ্গি বা ধুতি ব্যবহার করেন।
-
বাঁশ, কাঠ ও মাটির তৈরি ঘরে বসবাস।
-
জুম চাষ পাহাড়ি জীবনের অন্যতম অংশ।
তাদের জীবনধারা প্রকৃতিনির্ভর ও সরল।
খাদ্য সংস্কৃতি
পাহাড়ি খাবার সাধারণত কম মসলাযুক্ত ও স্বাস্থ্যকর—
-
বাঁশের ভেতর রান্না খাবার।
-
পাহাড়ি সবজি।
-
শুকনা মাছ।
-
দেশি মুরগি ও ভাত।
-
পাহাড়ি ফল (আনারস, কমলা, কলা)।
উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠান
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় উৎসব হলো বৈসাবি, যা বাংলা নববর্ষের সময় পালিত হয়।
-
বৈ – মারমা।
-
সা – চাকমা।
-
বি – ত্রিপুরা।
এই উৎসবে নাচ, গান, ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও পানিখেলা অনুষ্ঠিত হয়।
ধর্ম ও বিশ্বাস
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে—
-
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী (চাকমা, মারমা)।
-
হিন্দু ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী (ত্রিপুরা)।
-
প্রকৃতি পূজার প্রচলনও রয়েছে।
তারা ধর্মীয় সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী।
সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য
-
প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
-
অতিথিপরায়ণতা।
-
সংগীত ও নৃত্যের ঐতিহ্য।
-
সামাজিক সম্প্রীতি ও পারিবারিক বন্ধন।
খাগড়াছড়ির দর্শনীয় স্থানসমূহ
- আলুটিলা গুহা
খাগড়াছড়ির অন্যতম জনপ্রিয় স্থান। এটি একটি প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ আকৃতির গুহা। ভেতরে প্রবেশ করতে টর্চ লাইট দরকার হয়।
- রিছাং ঝরনা
খাগড়াছড়ি শহরের কাছেই অবস্থিত এই ঝরনাটি পাহাড়প্রেমীদের জন্য দারুণ আকর্ষণ।
- দেবতার পুকুর
দিঘিনালায় অবস্থিত এই প্রাকৃতিক পুকুর ঘিরে রয়েছে পাহাড় ও রহস্যময় গল্প।
- সাজেক ভ্যালি (আংশিক খাগড়াছড়ি)
সাজেক মূলত রাঙামাটি জেলার অন্তর্গত। মেঘ, পাহাড় আর সূর্যাস্তের জন্য বিখ্যাত।
- দিঘিনালা ঝুলন্ত সেতু
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ছবি তোলার জন্য আদর্শ স্থান।
- খাগড়াছড়ি টাউন ভিউ পয়েন্ট
পুরো শহর ও পাহাড়ের দৃশ্য একসাথে দেখতে পারবেন।
খাগড়াছড়ি যাওয়ার উপায়
খাগড়াছড়ি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি জেলা হওয়ায় সড়কপথই এখানে যাওয়ার প্রধান মাধ্যম। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে নিয়মিত বাস চলাচল করে।
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি
সরাসরি বাসে (সবচেয়ে সহজ)
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি সরাসরি বাস সার্ভিস রয়েছে।
জনপ্রিয় বাস সার্ভিস:
-
শান্তি পরিবহন।
-
এস আলম পরিবহন।
-
সৌদিয়া পরিবহন।
-
ইউনিক সার্ভিস।
বাস ছাড়ার স্থান:
-
কল্যাণপুর।
-
সায়েদাবাদ।
-
গাবতলী।
সময় লাগে: ৮–১০ ঘণ্টা।
ভাড়া: আনুমানিক ৬৫০–৯০০ টাকা (এসি/নন-এসি ভেদে)।
থাকার ব্যবস্থা
খাগড়াছড়িতে বিভিন্ন বাজেট অনুযায়ী হোটেল ও রিসোর্ট আছে:
বাজেট হোটেল
-
হোটেল শৈল সুবর্ণ।
-
হোটেল গিরিপথ।
রিসোর্ট
-
রিসাং রিসোর্ট।
-
পাহাড়িকা রিসোর্ট।
খাবার ও স্থানীয় স্বাদ
-
পাহাড়ি বাঁশের ভেতর রান্না খাবার।
-
পাহাড়ি সবজি।
-
দেশি মুরগি ও ভাত।
-
পাহাড়ি ফল (কমলা, আনারস)।
খাগড়াছড়ি ভ্রমণের সেরা সময়
অক্টোবর থেকে মার্চ — ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে ভালো।
বর্ষাকালে (জুন–সেপ্টেম্বর) পাহাড়ি রাস্তা পিচ্ছিল থাকে।
ভ্রমণ টিপস
-
পাহাড়ি এলাকায় স্থানীয় গাইড নিন।
-
পরিবেশ নষ্ট করবেন না।
-
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে সম্মান করুন।
-
রাতের ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন।
পরিশেষ
খাগড়াছড়ি শুধু একটি পর্যটন স্থান নয়, এটি প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল। পাহাড়, ঝর্ণা, মেঘ আর মানুষের সরল জীবনযাপন—সবকিছু মিলিয়ে খাগড়াছড়ি আপনার ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে করবে স্মরণীয়।
আপনি যদি প্রকৃতি ভালোবাসেন, তাহলে জীবনে একবার হলেও খাগড়াছড়ি ভ্রমণ অবশ্যই করা উচিত।

