District (জেলা)

চট্টগ্রাম: ইতিহাস, প্রকৃতি, দর্শনীয় স্থান ও খাবারের সম্পূর্ণ গল্প।

চট্টগ্রাম—বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য মিলনস্থল। পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন আর ব্যস্ত নগরজীবনের সমন্বয়ে চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় অঞ্চল। ইতিহাসের পাতায় যেমন চট্টগ্রামের গুরুত্ব অপরিসীম, তেমনি বর্তমানেও এটি অর্থনীতি, পর্যটন ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা চট্টগ্রামের ইতিহাস, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, দর্শনীয় স্থান, খাবার, যাতায়াত ও ভ্রমণ টিপস—সবকিছু একসাথে জানবো।

চট্টগ্রামের ইতিহাস

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক জনপদ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যকেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে চট্টগ্রাম নানা নাম ও শাসনের অধীনে থেকেছে, যা এর সমৃদ্ধ অতীতকে আরও বৈচিত্র্যময় করেছে।

  • প্রাচীন যুগ

ইতিহাসবিদদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই চট্টগ্রামে মানববসতির অস্তিত্ব ছিল। প্রাচীন গ্রন্থে এ অঞ্চলকে চট্টল, রাম্যভূমিচাটিগাঁওনামে উল্লেখ করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী হওয়ায় চট্টগ্রাম ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

  • আরব বণিক ও ইসলামের আগমন

৭ম–৮ম শতাব্দীতে আরব বণিকরা চট্টগ্রাম বন্দরে আগমন শুরু করে। তাদের মাধ্যমেই এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রচার ঘটে। আরব বণিকদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের সঙ্গে যুক্ত করে।

  • মধ্যযুগ: আরাকান ও সুলতানি শাসন

মধ্যযুগে চট্টগ্রাম কখনো আরাকান রাজ্য, আবার কখনো বাংলা সুলতানদের অধীনে ছিল। এই সময়ে চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ ও সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

  • মুঘল শাসন

১৬৬৬ সালে মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম দখল করেন এবং আরাকানিদের বিতাড়িত করেন। মুঘল আমলে চট্টগ্রামের নামকরণ করা হয় ইসলামাবাদ। এই সময় চট্টগ্রাম বন্দর ও প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে।

  • ব্রিটিশ শাসনামল

১৭৬০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামের শাসনভার গ্রহণ করে। ব্রিটিশ আমলে আধুনিক বন্দর, রেলপথ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। চট্টগ্রাম তখন ব্রিটিশ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহরে পরিণত হয়।

  • পাকিস্তান ও মুক্তিযুদ্ধ

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর চট্টগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়, যা ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা।

  • স্বাধীন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম

স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম দ্রুত দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে ওঠে। চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর এবং জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি।

ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল। এর ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক গঠন চট্টগ্রামকে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা করেছে।

ভৌগোলিক অবস্থান

চট্টগ্রাম বিভাগের উত্তরে ফেনী ও খাগড়াছড়ি জেলা, দক্ষিণে কক্সবাজার জেলা ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে পার্বত্য জেলা (বান্দরবান ও মিয়ানমার সীমান্ত) এবং পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর ও নোয়াখালী জেলা অবস্থিত। সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম প্রাচীনকাল থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কর্ণফুলী নদী এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম নগরী ও প্রধান সমুদ্রবন্দর।

প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য

চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এখানে একদিকে যেমন রয়েছে বিস্তৃত সমুদ্রসৈকত, অন্যদিকে রয়েছে পাহাড়, বন ও নদী।

  • পাহাড়ি অঞ্চল: চট্টগ্রামের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাংশ পাহাড়ি এলাকায় ঘেরা। ছোট-বড় টিলা ও পাহাড় এই অঞ্চলের প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা একে প্রাকৃতিকভাবে নান্দনিক করে তুলেছে।

  • সমুদ্র ও উপকূল: বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী হওয়ায় চট্টগ্রামে দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল রয়েছে। পতেঙ্গা ও আশপাশের এলাকা সমুদ্রঘেঁষা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত।

  • নদী ও খাল: কর্ণফুলী নদী ছাড়াও চট্টগ্রামে অসংখ্য ছোট খাল ও জলাশয় রয়েছে, যা নৌযোগাযোগ ও কৃষিকাজে সহায়ক।

  • বন ও সবুজ প্রকৃতি: পাহাড়ি বন, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও সবুজ টিলা চট্টগ্রামের পরিবেশকে সমৃদ্ধ করেছে।

জলবায়ু

চট্টগ্রামের জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র প্রকৃতির। গ্রীষ্মকালে আবহাওয়া গরম ও আর্দ্র থাকে, বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং শীতকালে আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে মনোরম থাকে।

চট্টগ্রামের উপজেলাসমূহ

চট্টগ্রাম জেলায় মোট ১৫টি উপজেলা১টি সিটি কর্পোরেশন এলাকা রয়েছে—

১. আনোয়ারা

সমুদ্র ও কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী উপজেলা। শিল্পাঞ্চল, মৎস্য ও লবণ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২. বাঁশখালী

পাহাড় ও সমুদ্রঘেরা উপজেলা। কৃষি, মৎস্য ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য পরিচিত।

৩. বোয়ালখালী

কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত। কৃষি, মাছ চাষ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিচিত।

৪. চন্দনাইশ

পাহাড়ি ও সমতল ভূমির সমন্বয়ে গঠিত উপজেলা। কৃষি ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখানে উল্লেখযোগ্য।

৫. ফটিকছড়ি

চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় উপজেলা। পাহাড়, বন ও কৃষিতে সমৃদ্ধ অঞ্চল।

৬. হাটহাজারী

শিক্ষা ও ধর্মীয় গুরুত্বের জন্য বিখ্যাত। দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসা এখানে অবস্থিত।

৭. লোহাগাড়া

পাহাড়ি ও সমতল এলাকার মিশ্রণ। কৃষি ও প্রবাসী আয়ে অর্থনীতি সমৃদ্ধ।

৮. মীরসরাই

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের জন্য পরিচিত। মহামায়া লেক ও ঝর্ণা এখানে অবস্থিত।

৯. পটিয়া

ঐতিহ্যবাহী উপজেলা। শিক্ষা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১০. রাঙ্গুনিয়া

কর্ণফুলী নদীঘেঁষা সবুজ উপজেলা। কৃষি ও মাছ চাষে পরিচিত।

১১. রাউজান

শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পরিচিত। শিক্ষার হার তুলনামূলক বেশি।

১২. সন্দ্বীপ

বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত একটি দ্বীপ উপজেলা। কৃষি, মৎস্য ও নৌ-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ।

১৩. সাতকানিয়া

কৃষি ও ধর্মীয় শিক্ষার জন্য পরিচিত। ধান ও সবজি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ।

১৪. সীতাকুণ্ড

পাহাড়, ঝর্ণা ও সমুদ্রের জন্য বিখ্যাত। চন্দ্রনাথ পাহাড় ও শিল্প এলাকা এখানে অবস্থিত।

১৫. কর্ণফুলী

নতুন গঠিত শিল্পঘন উপজেলা। কর্ণফুলী টানেল ও শিল্পাঞ্চলের জন্য পরিচিত।

১৬. চট্টগ্রাম মহানগর (সিটি কর্পোরেশন)

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দর ও প্রধান শিল্প এলাকা এখানে অবস্থিত।

চট্টগ্রামের দর্শনীয় স্থানসমূহ

  • পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত

চট্টগ্রাম শহরের কাছেই অবস্থিত পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত। সূর্যাস্ত দেখার জন্য এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। এখানে সমুদ্রের ঢেউ, কংক্রিট বাঁধ আর বাতিঘরের দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে।

  • ফয়েজ লেক

ফয়েজ লেক একটি কৃত্রিম লেক হলেও এর সৌন্দর্য অসাধারণ। পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত এই লেকে নৌভ্রমণ, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ও রিসোর্ট সুবিধা রয়েছে। পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য আদর্শ জায়গা।

  • চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক (দুলাহাজারা) চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় পর্যটন স্পট। এখানে মুক্ত পরিবেশে নানা প্রজাতির পশুপাখি দেখা যায়।

  • বাটালি হিল

চট্টগ্রাম শহরের সর্বোচ্চ পাহাড় বাটালি হিল। এখান থেকে পুরো শহর দেখা যায়। সূর্যাস্তের সময় জায়গাটি আরও বেশি মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে।

  • কর্ণফুলী নদী ও শাহ আমানত সেতু

কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত শাহ আমানত সেতু চট্টগ্রামের একটি আইকনিক স্থাপনা। সন্ধ্যায় আলোয় ঝলমল করা সেতুর দৃশ্য অসাধারণ।

  • এথনোলজিক্যাল মিউজিয়াম

বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস জানতে চাইলে এথনোলজিক্যাল মিউজিয়াম অবশ্যই ঘুরে দেখা উচিত।

চট্টগ্রামের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান

চট্টগ্রাম শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং এর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থানসমূহের জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত। বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের স্মারক বহনকারী এসব স্থাপনা চট্টগ্রামের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

  • বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.) মাজার

চট্টগ্রামের সবচেয়ে পরিচিত ধর্মীয় স্থানগুলোর একটি। সুফি সাধক হযরত বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.)–এর নামে প্রতিষ্ঠিত এই মাজারটি ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। মাজার সংলগ্ন পুকুরে কালো কচ্ছপ দেখা যায়, যা দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ।

  • আন্দারকিল্লা শাহী জামে মসজিদ

মুঘল আমলে নির্মিত এই মসজিদটি চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। ১৬৬৭ সালের দিকে নির্মিত এই মসজিদটি চট্টগ্রামে মুঘল শাসনের স্মৃতি বহন করে।

  • চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মন্দির

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত চন্দ্রনাথ পাহাড় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মন্দিরে প্রতিবছর হাজারো ভক্তের সমাগম ঘটে।

  • হামজারবাগ দরগাহ

এই দরগাহটি চট্টগ্রামের প্রাচীন সুফি ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের জন্য এটি পরিচিত।

  • বৌদ্ধ বিহার ও প্যাগোডা

চট্টগ্রামে বসবাসরত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য বেশ কিছু প্রাচীন বিহার ও প্যাগোডা রয়েছে। এগুলো বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

  • ওয়ার সিমেট্রি (War Cemetery)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ব্রিটিশ ও কমনওয়েলথ সৈন্যদের স্মরণে নির্মিত চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। এটি ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ।

  • আদালত ভবন ও ব্রিটিশ আমলের স্থাপনা

চট্টগ্রামে এখনো ব্রিটিশ আমলের কিছু প্রশাসনিক ভবন ও স্থাপনা রয়েছে, যা ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সাক্ষী।

চট্টগ্রামের খাবার ও খাদ্যসংস্কৃতি

চট্টগ্রামের খাবার ও খাদ্যসংস্কৃতি বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় স্বতন্ত্র ও বৈচিত্র্যময়। এই অঞ্চলের খাবারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ঝাল, মসলাদার স্বাদ এবং সামুদ্রিক মাছের ব্যবহার। ভৌগোলিক অবস্থান ও সমুদ্রঘেঁষা পরিবেশ চট্টগ্রামের খাদ্যসংস্কৃতিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে।

খাদ্যসংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য

চট্টগ্রামের মানুষ সাধারণত ঝালপ্রিয়। এখানে শুকনা মরিচ, কালো মরিচ ও বিশেষ ধরনের মসলা বেশি ব্যবহৃত হয়। অনেক খাবারেই শুঁটকি, নাপ্পি (ফার্মেন্টেড মাছ) ও সামুদ্রিক মাছ ব্যবহার করা হয়, যা চট্টগ্রামের খাবারকে অনন্য স্বাদ দেয়।

জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী খাবার

  • মেজবানির গরুর মাংস

মেজবানি চট্টগ্রামের সবচেয়ে বিখ্যাত খাবার। এটি মূলত সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অতিথিদের জন্য রান্না করা হয়। বিশেষ মসলা ও ঝাল স্বাদে রান্না করা এই গরুর মাংস চট্টগ্রামের গর্ব।

  • কালাভুনা

কালাভুনা চট্টগ্রামের আরেকটি জনপ্রিয় খাবার। গরু বা খাসির মাংস কম তেলে ও বেশি মসলা দিয়ে ভুনা করা হয়, যা অত্যন্ত সুস্বাদু ও ঝাল।

  • শুঁটকি মাছের পদ

শুঁটকি ভর্তা, শুঁটকি ভুনা ও শুঁটকি ভাজি চট্টগ্রামের খাবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশি ও সামুদ্রিক নানা প্রজাতির শুঁটকি মাছ এখানে প্রচলিত।

  • নাপ্পি

নাপ্পি হলো ফার্মেন্টেড মাছ দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ উপাদান, যা ভর্তা বা তরকারিতে ব্যবহার করা হয়। এর স্বাদ ও গন্ধ আলাদা হলেও চট্টগ্রামের মানুষের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

  • সামুদ্রিক মাছ ও চিংড়ি

রূপচাঁদা, লইট্টা, পোয়া, কোরাল ও চিংড়ি মাছ চট্টগ্রামের খাবারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এগুলো ভাজা, ঝোল বা ভুনা—সবভাবেই রান্না করা হয়।

  • চিটাগাং স্টাইল বিরিয়ানি

চট্টগ্রামের বিরিয়ানি তুলনামূলকভাবে বেশি ঝাল ও মসলাদার। এতে আলুর পরিবর্তে বিশেষ মসলা ও মাংসের স্বাদকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

স্ট্রিট ফুড ও মিষ্টান্ন

চট্টগ্রামের রাস্তাঘাটেও নানা ধরনের জনপ্রিয় খাবার পাওয়া যায়—

  • ঝাল চানাচুর।

  • সমুচা ও সিঙ্গারা।

  • ফুচকা ও চটপটি।

  • বিভিন্ন ধরনের পিঠা (বিশেষ করে শীতকালে)।

চট্টগ্রাম যাওয়ার উপায়

সড়কপথে:

ঢাকা থেকে বাসে চট্টগ্রাম যেতে ৫–৭ ঘণ্টা সময় লাগে। গ্রীন লাইন, সৌদিয়া, শ্যামলীসহ অনেক মানসম্মত বাস রয়েছে।

রেলপথে:

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সুবর্ণ এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতীসহ বেশ কয়েকটি ট্রেন চলাচল করে।

আকাশপথে:

ঢাকা থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়মিত ফ্লাইট রয়েছে।

পরিশেষ

চট্টগ্রাম শুধু একটি শহর নয়—এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য অধ্যায়। পাহাড় আর সমুদ্রের মেলবন্ধনে গড়া এই অঞ্চল যে কোনো ভ্রমণপিপাসুর মন জয় করবে। আপনি যদি বাংলাদেশ ঘুরতে চান, তাহলে চট্টগ্রাম অবশ্যই আপনার ভ্রমণ তালিকায় রাখুন।

Sheikh Farid Uddin

About Author

আমি Sheikh Farid Uddin, একজন শিক্ষার্থী। ভ্রমণ, ইতিহাস ও বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান নিয়ে গবেষণা করা এবং সেগুলোকে তথ্যবহুল লেখার মাধ্যমে মানুষের কাছে তুলে ধরাই আমার মূল আগ্রহ। আমি বিশ্বাস করি—ভালো তথ্য মানুষকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে এবং একটি জায়গার প্রকৃত সৌন্দর্য ও ইতিহাস জানতে অনুপ্রাণিত করে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

District (জেলা)

রাঙামাটি: পাহাড়, লেক আর প্রকৃতির রঙে রাঙামাটি।

বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকার অন্যতম সৌন্দর্যময় জেলা রাঙামাটি। পাহাড়, লেক, নদী আর সবুজ প্রকৃতির অপরূপ মেলবন্ধনের জন্য একে কেউ বলে “লেক
District (জেলা)

ময়মনসিংহ জেলা: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য জনপদ।

বাংলাদেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত ময়মনসিংহ জেলা ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য সমন্বয়। ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই