বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা চন্দ্রনাথ পাহাড়। চট্টগ্রাম বিভাগের সীতাকুণ্ড উপজেলার উপর দাঁড়িয়ে আছে এই পর্বতশ্রেণি। প্রকৃতি, ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, অ্যাডভেঞ্চার—সবকিছু মিলিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড় এখন রোমাঞ্চপ্রেমী, প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষদের কাছে স্বপ্নের নাম। সারা বছর পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে এখানে।
চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ইতিহাস ও পরিচয়
চন্দ্রনাথ পাহাড় শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আঁধার নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক-ধর্মীয় স্থানও। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত চন্দ্রনাথ মন্দির। ধারণা করা হয়, মন্দিরটি প্রায় হাজার বছরের পুরনো। পুরাণ মতে, দেবী সতীর দেহাংশ পতনের একটি অংশ এখানে পড়েছিল বলেও একটি জনপ্রিয় গল্প প্রচলিত আছে।
শিবভক্তদের কাছে এই স্থান বিশেষভাবে পবিত্র। প্রতিবছর মহাশিবরাত্রি উপলক্ষে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী এখানে ভিড় করেন। তখন পাহাড়ের চারপাশে মেলা বসে এবং পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
চন্দ্রনাথ পাহাড় কোথায়? কিভাবে যাবেন
চন্দ্রনাথ পাহাড় চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলায় অবস্থিত। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কমলাপুর থেকে সীতাকুণ্ড খুব সহজেই যাওয়া যায়।
ঢাকা থেকে যাওয়ার উপায়
-
বাসে চট্টগ্রাম/সীতাকুণ্ড যাওয়া যায়।
-
গ্রামের বাড়ি, সেন্টমার্টিন/ইত্যাদি রুটে চলা যেকোনো গাড়িতে নামতে পারো সীতাকুণ্ডে।
-
সময় লাগবে ৫–৬ ঘণ্টা।
চট্টগ্রাম থেকে
-
লোকাল/বাস/প্রাইভেট গাড়িতে সীতাকুণ্ড ৩০–৪০ মিনিটের পথ।
সীতাকুণ্ড বাজার থেকে পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত রিকশা/অটোরিকশা পাওয়া যায় সহজে।
চন্দ্রনাথ পাহাড়ে উঠার অভিজ্ঞতা
চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ওঠার পথটা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং। যারা ট্রেকিং পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি দারুণ অভিজ্ঞতা।
উঠার দুইটি প্রধান পথ আছে
- সিঁড়ি পথ।
- খাড়াই পাহাড়ি পথ।
সিঁড়ি পথে ওঠা তুলনামূলক সহজ হলেও লম্বা পথ হওয়ায় সময় লাগে। খাড়াই পাহাড়ি পথটা একটু কঠিন, তবে দ্রুত ওঠা যায়।
নীচ থেকে চূড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে সাধারণত ১-২ ঘন্টা সময় লাগে।
চূড়ায় দাঁড়িয়ে মন হারানো দৃশ্য
চূড়ায় উঠলে দেখা যায়:
-
পুরো সীতাকুণ্ডের ম্যাপ।
-
নিচে শহরের বাড়িঘর।
-
পাহাড়ি বন।
-
দূরে নীল সমুদ্র।
-
সূর্যোদয়/সূর্যাস্ত।
-
মেঘের ভেলা।
অনেক সময় পাহাড়ের উপরে মেঘ এসে ধরা দেয়। তখন মনে হয় যেন আকাশের ভিতরে দাঁড়িয়ে আছো! রাত হলে তারাভরা আকাশ পাহাড়টাকে অন্য এক রূপ দেয়।
চন্দ্রনাথ মন্দির
পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় রয়েছে বিখ্যাত চন্দ্রনাথ মন্দির। এখানে শিবলিঙ্গ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বছরব্যাপী ভক্তরা দর্শনে আসেন। বিশেষ করে শিবরাত্রির সময় পুরা এলাকা জমজমাট হয়ে ওঠে।
মন্দির ঘিরে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত। হিন্দু ধর্ম অনুসারে চন্দ্রনাথ পাহাড় তীর্থস্থান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
আশপাশে দেখার মতো আরও কয়েকটি জায়গা
চন্দ্রনাথ পাহাড়ের আশেপাশে আরও কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে।
-
সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক।
-
গুলিয়াখালী সী বিচ।
-
বাঁশবাড়িয়া সী বিচ।
-
কমলদাহ ঝর্ণা।
-
বারৈয়ারহাট বাজার।
একদিনেই ইচ্ছা করলে ৩–৪টি স্পট দেখা সম্ভব।
চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ভ্রমণের সময় সতর্কতা
যেহেতু এটি পাহাড়ি এলাকা, তাই কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরী:
- যথেষ্ট পানি সাথে রাখবেন।
- রাস্তায় স্লিপ হতে পারে, সাবধানে হাঁটবেন।
- রাতের আগে নেমে আসার চেষ্টা করবেন।
- প্রবল বর্ষা/বজ্রপাতের সময় ওঠা ঠিক নয়।
- বৃদ্ধ/হৃদরোগী/অসুস্থ ব্যক্তি সাবধানতা অবলম্বন করবেন।
ব্যয় কত হতে পারে? (আনুমানিক)
-
ঢাকা–সীতাকুণ্ড বাস: ৳500–৳1200।
-
সীতাকুণ্ড থেকে পাহাড়ের পাদদেশ: ৳20–৳50।
-
খাবার: ৳100–৳250।
-
গাইড নিলে: ৳200–৳500।
মোট খরচ ৬০০–১৫০০ টাকার মধ্যেই ঘুরে আসা সম্ভব।
কেন চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাবেন?
কারণগুলো হলো:
- অ্যাডভেঞ্চার + ট্রেকিং।
- ধর্মীয় স্থান।
- চূড়া থেকে অসাধারণ দৃশ্য।
- পরিবার/বন্ধু/দম্পতির ভ্রমণের জন্য আদর্শ।
- দ্রুত ট্যুর—১ দিনে ঘুরে আসা যায়।
পরিশেষ
চন্দ্রনাথ পাহাড় প্রকৃতিপ্রেমী, ধর্মীয় পর্যটক এবং ট্রেকিং অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য অনন্য গন্তব্য। ekhane এসে আপনি প্রকৃতি, ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও রোমাঞ্চ—সবকিছুর স্বাদ পাবেন। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দূরের শহর দেখা অথবা সূর্যাস্ত উপভোগ—জীবনের অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

