বাংলাদেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত শেরপুর জেলা প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য সংমিশ্রণ। পাহাড়ঘেরা সবুজ বন, নদী-খাল, কৃষিভিত্তিক জীবনযাপন এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো শেরপুরকে করেছে আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। যারা প্রকৃতি ভালোবাসেন বা ইতিহাস জানতে আগ্রহী—তাদের জন্য শেরপুর নিঃসন্দেহে একটি আকর্ষণীয় জেলা।
শেরপুর জেলার ভৌগোলিক অবস্থান
শেরপুর জেলা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগে অবস্থিত একটি উত্তর সীমান্তবর্তী জেলা। এর ভৌগোলিক অবস্থান দেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলে।
-
উত্তরে: ভারতের মেঘালয় রাজ্য।
-
দক্ষিণে: ময়মনসিংহ জেলা।
-
পূর্বে: নেত্রকোনা জেলা।
-
পশ্চিমে: জামালপুর জেলা।
শেরপুর জেলার একটি বড় অংশ ভারতের সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় এখানে টিলা ও পাহাড়ি ভূমির প্রভাব দেখা যায়। জেলার উত্তরাংশে বনভূমি ও উঁচু-নিচু ভূমি রয়েছে, আর দক্ষিণাংশ অপেক্ষাকৃত সমতল ও কৃষি উপযোগী। ভোগাই, চেল্লাখালীসহ বিভিন্ন নদী জেলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
নামকরণের ইতিহাস
শেরপুর নামের পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক গল্প। ধারণা করা হয়, প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে “শের আলী গাজী” নামক এক প্রভাবশালী ব্যক্তি বসবাস করতেন। তার নামানুসারেই এলাকাটির নাম হয় “শেরপুর”। আবার কেউ কেউ মনে করেন, “শের” অর্থ বাঘ—এই অঞ্চলে একসময় বাঘের আধিক্য থাকায় নামটি প্রচলিত হয়।
প্রশাসনিক কাঠামো
শেরপুর জেলায় মোট ৫টি উপজেলা রয়েছে—
১. শেরপুর সদর
জেলার প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল ও বড় বাজার এখানে অবস্থিত।
২. নালিতাবাড়ী
ভারত সীমান্তসংলগ্ন উপজেলা। পাহাড়ি প্রকৃতি ও পর্যটন স্পটের জন্য পরিচিত। কৃষি ও পর্যটন এখানকার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত।
৩. শ্রীবরদী
কৃষিনির্ভর উপজেলা। ধান, শাকসবজি ও গবাদি পশুপালনে এ উপজেলার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
৪. ঝিনাইগাতী
পাহাড়ঘেঁষা ও বনভূমি সমৃদ্ধ এলাকা। গজনী অবকাশ কেন্দ্র ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য সুপরিচিত।
৫. নকলা
ব্যবসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নত উপজেলা। কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা।
জনসংখ্যা ও ভাষা
শেরপুর জেলার অধিকাংশ মানুষ বাংলা ভাষাভাষী। পাশাপাশি গারো, হাজংসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষও এখানে বসবাস করে, যা জেলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এখানকার মানুষ সাধারণত সহজ-সরল ও অতিথিপরায়ণ।
অর্থনীতি ও কৃষি
শেরপুর জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। ধান, পাট, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন শাকসবজি এখানকার প্রধান কৃষিপণ্য। এছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় গবাদি পশুপালনও বেশ জনপ্রিয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও প্রবাসী আয়ের প্রভাবেও জেলার অর্থনীতি ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি
শেরপুর জেলায় প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সংস্কৃতির দিক থেকে শেরপুর বেশ সমৃদ্ধ। লোকসংগীত, পালাগান, জারি-সারি গান এবং বিভিন্ন গ্রামীণ উৎসব এখানকার মানুষের জীবনের অংশ।
দর্শনীয় স্থান
শেরপুরে ঘুরে দেখার মতো বেশ কিছু মনোমুগ্ধকর স্থান রয়েছে—
-
গজনী অবকাশ কেন্দ্র (ঝিনাইগাতী): পাহাড়, লেক ও বনভূমির সমন্বয়ে একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।
-
মধুটিলা ইকোপার্ক: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর একটি স্থান।
-
ভোগাই নদী: প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য দারুণ আকর্ষণ।
-
হাজং ও গারো পল্লি: নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সংস্কৃতি জানার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
যোগাযোগ ব্যবস্থা
শেরপুর জেলা সড়কপথে দেশের অন্যান্য জেলার সঙ্গে সংযুক্ত। ঢাকা থেকে বাসযোগে সহজেই শেরপুরে পৌঁছানো যায়। যদিও রেল যোগাযোগ সীমিত, তবে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা দিন দিন উন্নত হচ্ছে।
শেরপুরের গুরুত্ব
শেরপুর শুধু একটি জেলা নয়—এটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষি, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে এই জেলার ভূমিকা জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষ
সবুজ প্রকৃতি, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং সহজ-সরল মানুষের বসবাস—এই তিনের মেলবন্ধনেই গড়ে উঠেছে শেরপুর জেলা। যারা প্রকৃতির কাছে কিছুটা সময় কাটাতে চান কিংবা বাংলাদেশের অজানা সুন্দর অঞ্চলগুলো জানতে চান, তাদের জন্য শেরপুর হতে পারে একটি আদর্শ গন্তব্য।

