বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত হবিগঞ্জ জেলা সিলেট বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী জেলা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদ-নদী, চা-বাগান, হাওর, পাহাড়ি টিলা ও সমৃদ্ধ ইতিহাস—সব মিলিয়ে হবিগঞ্জ এক অনন্য জনপদ হিসেবে পরিচিত।
ভৌগোলিক অবস্থান
হবিগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের সিলেট বিভাগে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এটি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থান করছে এবং প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ।
হবিগঞ্জ জেলার ভৌগোলিক সীমা হলো—
-
উত্তরে: সিলেট জেলা
-
দক্ষিণে: ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ জেলা
-
পূর্বে: মৌলভীবাজার জেলা
-
পশ্চিমে: সুনামগঞ্জ জেলা
জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে কুশিয়ারা নদী, যা এ অঞ্চলের কৃষি ও জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়াও ছোট-বড় অনেক নদী, খাল ও বিল রয়েছে। হবিগঞ্জের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাংশে টিলা ও পাহাড়ি ভূমি দেখা যায়, আর পশ্চিম ও উত্তরাংশে রয়েছে হাওর ও সমতল ভূমি।
নামকরণের ইতিহাস
হবিগঞ্জ জেলার নামকরণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে একাধিক মত প্রচলিত রয়েছে। সবচেয়ে প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী, হবিবুর রহমান নামে একজন প্রভাবশালী ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে বসবাস করতেন। তাঁর নামানুসারেই এলাকাটি প্রথমে “হবিবগঞ্জ” নামে পরিচিত হয়। সময়ের পরিবর্তনে ও ভাষাগত সহজতার কারণে “হবিবগঞ্জ” থেকে ধীরে ধীরে “হবিগঞ্জ” নামটি প্রচলিত হয়ে ওঠে।
অন্য একটি মত অনুযায়ী, মুসলিম শাসনামলে এখানে বসতি স্থাপনকারী একজন সম্মানিত ব্যক্তির নামের সঙ্গে “গঞ্জ” শব্দ যুক্ত হয়ে এই এলাকার নামকরণ করা হয়। তখন “গঞ্জ” শব্দটি বাজার, বাণিজ্যকেন্দ্র বা জনবসতিপূর্ণ স্থান বোঝাতে ব্যবহৃত হতো।
ঐতিহাসিকভাবে বলা যায়, হবিগঞ্জ নামটি এই অঞ্চলের ধর্মীয় প্রভাব, মানবিক নেতৃত্ব এবং বাণিজ্যিক গুরুত্বের সাক্ষ্য বহন করে। আজও এই নামের মধ্যেই জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পরিচয় ফুটে ওঠে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
হবিগঞ্জের ইতিহাস বহু প্রাচীন। ব্রিটিশ আমলে এটি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জের মানুষের অবদান গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এ জেলার বহু মানুষ জীবন উৎসর্গ করেন।
অর্থনীতি ও কৃষি
হবিগঞ্জের অর্থনীতি প্রধানত কৃষিনির্ভর। ধান, চা, সবজি, পাট ও মাছ চাষ এখানকার প্রধান আয়ের উৎস। দেশের অন্যতম বৃহৎ চা উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবেও হবিগঞ্জ পরিচিত। এছাড়া গ্যাসক্ষেত্র ও প্রবাসী আয়ের বড় অবদান রয়েছে।
হবিগঞ্জের উপজেলাসমূহ
হবিগঞ্জ জেলায় মোট ৯টি উপজেলা রয়েছে—
১. হবিগঞ্জ সদর
জেলার প্রশাসনিক, শিক্ষা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, হাসপাতাল, কলেজ ও বড় বাজার অবস্থিত।
২. লাখাই
কৃষিপ্রধান উপজেলা। ধান, সবজি ও মাছ চাষের জন্য পরিচিত। গ্রামীণ জীবনযাত্রা এখানে খুবই স্বাভাবিক ও শান্ত।
৩. নবীগঞ্জ
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিতে এ উপজেলার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
৪. বানিয়াচং
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উপজেলা। হাওর অঞ্চল হওয়ায় মাছ চাষ ও ধান উৎপাদনে বিখ্যাত।
৫. আজমিরীগঞ্জ
হাওরবেষ্টিত এলাকা। মৎস্য সম্পদ ও নৌপথ এখানকার অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি।
৬. মাধবপুর
শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এই উপজেলার ওপর দিয়ে গেছে।
৭. চুনারুঘাট
চা বাগান, পাহাড়ি টিলা ও বনাঞ্চলের জন্য পরিচিত। রেমা-কালেঙ্গা সংরক্ষিত বন এই উপজেলায় অবস্থিত।
৮. বাহুবল
কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা নির্ভর উপজেলা। শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে।
৯. শায়েস্তাগঞ্জ
নবগঠিত ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। রেলওয়ে জংশন ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও দর্শনীয় স্থান
হবিগঞ্জ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলো হলো—
-
চা বাগান (চুনারুঘাট ও মাধবপুর অঞ্চল)।
-
হাওর ও বিল অঞ্চল।
-
শাহজালাল (র.) ও শাহমুস্তাফা (র.) স্মৃতিবিজড়িত স্থান।
-
রেমা-কালেঙ্গা সংরক্ষিত বন।
-
বাল্লা ও সাতছড়ি এলাকা।
প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য হবিগঞ্জ একটি আদর্শ গন্তব্য।
ভাষা ও সংস্কৃতি
হবিগঞ্জের মানুষ মূলত বাংলা ভাষায় কথা বলে, তবে আঞ্চলিক ভাষা ও টান রয়েছে। এখানকার লোকসংগীত, পালাগান, বাউল সংস্কৃতি ও গ্রামীণ উৎসব অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নবান্ন, ঈদ ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
হবিগঞ্জে রয়েছে বেশ কয়েকটি কলেজ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি জেলা সদর ও উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে, যা মানুষের মৌলিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করছে।
পরিশেষ
ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সংমিশ্রণ হলো হবিগঞ্জ জেলা। এই জেলা শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, বরং সংস্কৃতি ও সংগ্রামের এক জীবন্ত স্মারক। ভবিষ্যতে পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে হবিগঞ্জ আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

